নামাজ

1932

মুসল্লীর সুতরা

মুসল্লীর সুতরা

যা মুসল্লী ও তার সামনে দিয়ে গমনকারীর মাঝে রাখা হয়

সুতরার শরীয়তসিদ্ধতা

মুকীম ও মুসাফির উভয়ের ক্ষেত্রে সুতরা রাখা শরীয়তসিদ্ধ। ফরয ও নফল সকল নামাজে, হোক তা মসজিদের ভিতরে অথবা বাইরে; হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«যখন তোমাদের কেউ নামাজ পড়ে সে যেন সুতরা সামনে রেখে নামাজ পড়ে এবং এর কাছাকাছি দাঁড়ায়।»(বর্ণনায় আবু দাউদ)

ওয়াহব রাযি. বলেন, «রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় আমাদের ইমামতি করলেন। তিনি তাঁর একটি নাতিদীর্ঘ কাঠের লাঠি সামনে গেড়ে নিলেন। এরপর আমাদের নিয়ে দু রাকাত নামাজ পড়লেন।»(বর্ণনায় আহমদ)

সুতরা রাখার হুকুম

সুতরা রাখা সুন্নত; কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য সুতরা রাখার ব্যাপারে নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন। অতএব সামনে দিয়ে লোক চলাচলের আশঙ্কা করলে সুতরা রাখা আবশ্যক। উপরন্তু মুসল্লী ও সুতরার মাঝে যে জায়গা থাকে সেখান দিয়ে কেউ গমন করলে তাকে বাধা দেয়াও জরুরি। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«তোমাদের কেউ যেন সুতরা ব্যতীত নামাজ না পড়ে। আর কাউকে তোমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে দিয়ো না। যদি গমনকারী ব্যক্তি বিরত না হয়, তাহলে তার সাথে লড়াই করবে।»
(বর্ণনায় ইবনে খুযাইমা)

সুতরার হিকমত

সুতরা রাখার বিধানে রয়েছে অনেক হিকমত। তন্মধ্যে কিছু হলো নিম্নরূপ:

১. মুসল্লীর সম্মুখ দিয়ে চলাচল বন্ধ করা; কেননা চলাচল অবাধ থাকলে মুসল্লীর খুশুখুজুতে ব্যাঘাত ঘটে।

২. সুতরা একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায়ে মুসল্লীকে সহায়তা দেয়।

৩. নারী, কুকুর ও গাধা মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করায় নামাজ ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে সুতরার মাধ্যমে নিরাপদে থাকা যায়। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«তোমাদের কেউ যখন নামাজ পড়তে দাঁড়াবে, যদি হাতের কাছে থাকে, তাহলে যেন সে সোয়ারীর গদির পেছনের কাষ্টখন্ডের ন্যায় [একহাত বা তার থেকেও দীর্ঘ ] কিছু দিয়ে সুতরা দেয়। আর যদি এরূপ না পায়, তাহলে গাধা, নারী ও কালো কুকুর তার নামাজ ভেঙ্গে দেবে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি বললাম, হে আবু যর! কুকুর নিয়ে সমস্যা কী? লাল অথবা হলুদ কুকুর থেকে কালো কুকুরের পার্থক্যটা কোথায়? তিনি বললেন, «হে আমার ভ্রতুষ্পুত্র, তুমি আমাকে যেভাবে জিজ্ঞাসা করলে আমিও সেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি উত্তরে বলেছেন,«কালো কুকুর শয়তান।»(বর্ণনায় মুসলিম)

ইমাম নববী (র:) বলেন, এখানে নামায ভেংগে দেয়ার অর্থ নামাযের খুশু খুযু নষ্ট করে দেয়; এর অর্থ এ নয় যে নামায নষ্ট করে দেয়।

সুতরার কিছু আহকাম

১. সুতরা অবলম্বন ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুক্তাদীর জন্য সুতরার প্রয়োজন নেই; কেননা ইমামের সুতরাই মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:«আমি একটি গাধীর ওপর সোয়ার হয়ে আগমন করলাম। আমি সে সময় প্রাপ্তবয়ষ্ক হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন মিনায় সাহাবীদের ইমামতি করছিলেন। আমি একটি কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলাম। সোয়ারী থেকে নামলাম। গাধীটিকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিলাম। এরপর আমি নামাজের কাতারে ঢুকে পড়লাম। এ বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ জানালো না।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম )নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা বৈধ নয়। এটি বরং কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করায় কী গুনাহ রয়েছে মানুষ যদি তা জানত তাহলে নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চাইতে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকাও তার কাছে উত্তম বলে মনে হত।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম) আবুন নদর বলেন,«আমি জানি না, তিনি চল্লিশ দিন বললেন, না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর?

২. কিন্তু যদি সুতরার বাইরে দিয়ে অতিক্রম করে অথবা সুতরা না থাকাবস্থায় সিজদার জায়গার বাইরে দিয়ে অতিক্রম করে, তবে গুনাহ হবে না।

৩. সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তিকে বাধা দেয়া নামাজরত ব্যক্তির একটি আবশ্যক দায়িত্ব। আবু সাঈদ খুদরী রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,«যদি তোমাদের কেউ এমন জিনিস সামনে রেখে নামাজ পড়ে যা মানুষ থেকে তাকে আড়াল করে দেয় আর কেউ তার সামনে দিয়ে (সিজদার জায়গার ভিতর দিয়ে) অতিক্রম করতে চায়, তাহলে সে যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। আর যদি সে ক্ষান্ত না হয়, তবে তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে; কেননা সে শয়তান।»
(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

৪. আলেমদের কেউ কেউ মসজিদুল হারামকে সুতরা বিষয়ক উল্লিখিত নীতিমালার বাইরে হিসাব করেছেন। মসজিদুল হারামে তারা নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা বৈধ বলেছেন। তাদের দলিল হলো, «রাফউল হারাজ» তথা অসুবিধা দূরকরণ-বিষয়ক কুরআন সুন্নাহর প্রমাণাদি। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মসজিদুল হারামে সুতরার বিধান বহাল রাখা মুসল্লীদেরকে সঙ্কট-সমস্যায় নিপতিত করবে।

৫. দেয়াল, মসজিদের পিলার, আলমারি অথবা লাঠি সুতরা হিসাবে ব্যবহার করা যাবে।

৬. মুসল্লী ও সুতরার মাঝখানকার জায়গার পরিমাপ হলো একটি বকরী অতিক্রম করার মতো জায়গা। সাহল রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন,«রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামাজে দাঁড়ানোর স্থান ও দেয়ালের মাঝে একটি বকরী অতিক্রম করার পরিমাণ জায়গা ছিল।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

নারীর অতিক্রমণে নামাজ ভেঙ্গে যাওয়া

নারী, গাধা ও কালো কুকুর নামাজরত পুরুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে নামাজ ভেঙ্গে যাওয়ার উল্লিখিত হাদীসে নারীকে গাধা ও কুকুরের সাথে কখনোই তুলনা করা হয়নি। অর্থাৎ যে কারণে কালো কুকুর সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে নামাজ ভেঙ্গে যায় ঠিক একই কারণে নারী অতিক্রম করলেও নামাজ ভেঙ্গে যায়, বিষয়টি সে রকম নয়।

হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী কালো কুকুর শয়তান। এর অর্থ এটা নয় যে নারী ও গাধাও শয়তান। হাদীসে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ের প্রতিটির কারণ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যদিও তিনটিকে একই ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করা হয়েছে। কুকুর কেন নামাজ ভেঙ্গে দেয়, তার কারণ সরাসরি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে অবশিষ্ট দুটির কারণ উল্লেখ করা হয়নি। যার অর্থ দাঁড়ায়, অবশিষ্ট দুটোর নামাজ ভেঙ্গে দেওয়ার কারণও ভিন্ন।

নারী কেন পুরুষের নামাজ ভেঙ্গে দেয় তা অনুমান করে বলা যায় যে, পুরুষের সিজদার জায়গার ভিতর দিয়ে নারী গমন করলে পুরুষের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। নামাজ থেকে পুরুষের মনোযোগ সম্পূর্ণরূপে উঠে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। আর এটা অনিস্বীকার্য যে কোনো পুরুষ অতিক্রম করার চেয়ে নারীর অতিক্রমণে পুরুষের দৃষ্টি অধিকমাত্রায় আকৃষ্ট হয়। এ জন্যেই নারীর অতিক্রমকে শরীয়ত প্রবর্তক নামাজভঙ্গকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, যাতে নামাজে খুশুখুজু বজায় থাকে। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।